নোতুন খবর.কম : পাশাপাশি মাজার ও মন্দির। মাঝ খানে একটি সরু রাস্তা । দুরত্ব মাত্র ৫ গজ। ২৪২ বছর হলো মাজার ও মন্দিরে ভক্তরা আসা যাওয়া করলেও দুই সম্প্রদায়ের মাঝে আজও কোন ঝগড়া হয়নি।
দেখা গেছে, বগুড়া শহরের করতোয়া নদীর পাশে ফতেহ আলী বাজার। বাজারে প্রবেশে ২০গজ দুরেই পাশাপাশি শাহ্ সুফি ফতেহ আলী (রাঃ) অসকারীর মাজার ও পাশেই আনন্দময়ী কালি মন্দির। প্রতিদিন শত শত ভক্ত মাজার জিয়ারত করতে এবং মন্দিরে পুজো দিতে ভিড় জমায়।
ইসলামিক কালচারাল এন্ড ফিচার সার্ভিস প্রকাশনা থেকে আব্দুর রহিম বগরা লিখিত হযরত শাহ্ সুফি ফতেহ আলী (রাঃ) অসকারীর জীবন কথা পাওয়া যায়। ১৬৮৪ সালে ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের আস্কাল নামক স্থান থেকে চীনে গমন করে। পরে ভারতের আজমী শরিফে ১২ বছর অবস্থান করে। এর পর পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম দিনাজপুর জেলায় আসেন। তার পর বাংলাদেশের মহাস্থান গড়ে অবস্থান নেন। সব শেষে বগুড়া শহরের করতোয়া নদীর পাড়ে তার অনুসারীদের নিয়ে অবস্থান করে। সেখানেই উনার মৃত্যু হয় ১৭৭৭ সালে। ওভানেই তাকে দাফন করা হয়। তার কবরস্থান টি ফতেহ আলী মাজার নামে পরিচিত।
ওই এলাকার নাম ছিল আগে কুন্ডু পাড়া। সেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল বেশি। ফতেহ আলীর মাজারকে ঘিরেই বিভিন্ন দোকান ও ফতেহ আলী বাজার গড়ে উঠে । ফতেহ আলী মাজারের খাদেম মোঃ হায়দার আলী খতিব জানান, ৫৬ বছর যাবত তিনি খাদেম এর দায়িত্বে রয়েছেন। এর আগে উনার বাবা ও দাদারা বংশানুক্রমে খাদেম ছিল। তিনি আরো জানান, প্রতিদিন শত শত মানুষ মাজার জিয়ারত করতে আসেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনও কালি মন্দিরে পুজো দিয়ে মাজারে সালাম করে চলে যান।
২৪২ বছর আগে শাহ্ সুফি ফতেহ আলী (রাঃ) অসকারীর ওফাত (মুত্যু) গেলে মাজারটি গড়ে উঠে। ২২ বৈশাখ ওনার মৃত্যু দিবসকে কেন্দ্র করে জিকির আসকার হয়। হাজার হাজার ভক্তদের মাঝে ওই সময় খাবার বিতরণ করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভক্তরাও আসেন। দাদা ও বাবা মুখে শুনেছি এবং এখন আমি দায়িত্বে রয়েছি । কোন দিন মন্দিরের পুরহিত কিম্বা পুজারিদের সাথে মাজারে আসা ভক্ত এবং মাজারের লোকজনের সাথে কটু কথা হয়নি। পাশাপাশি আমরা রয়েছি। সন্ধ্যায় মন্দিরের ঘন্টার ধনিতে আমাদের কোন সমস্যা হয়না।
শহরের ধরমপুর থেকে মাজারে এসেছিল আব্দুল হামিদ । তিনি জানালেন , কিছু সমস্যায় আছি । তাই মাজার জিয়ারত করতে এসেছিলাম । রহমান নগর এলাকার সায়েদ আলীও জানালেন, একই কথা। তারা আরো বলেন, অনেক বার মাজারে এসেছি। কিন্ত কখনও মাজার ও মন্দিরের ভক্তদের মাঝে কোন খারাপ সম্পর্ক দেখিনি। মাজার জিয়ারত করে কেউবা পুজারির সাথে কুশল বিনিময় করছে । আবার পুজোর শেষে বের হয়ে কেউবা মাজারের ভক্তদের সাথে মত বিনিময় করছে । এমন দৃশ্য মাঝে মাঝেই দেখা যায়।
আনন্দময়ী কালি মন্দিরের পুরহিত শ্রী জয়রাম পান্ডে জানান, বাবা দাদুর আমল থেকেই বংসানূক্রমে আমি এই কালি মন্দিরের পুরহিতের দায়িত্বে রয়েছি। পূর্ব পুরুদের কাছ থেকেও শুনিনি উপাশনা নিয়ে কখনও মাজারে ভক্তদের কিম্বা তাদের লোকজনদের সাথে দু’কথা হয়েছে। একদম পাশাপাশি দু’ধর্মের দুটি পূর্ণস্থান । কখনও মাজারের জিকির আসকারে পুজারিরা এবং আমি বিব্রতবোধ করিনি। মিলেমিশে যার যার ধর্ম আমরা পালন করে আসছি। তিনি আরো জানান, এই এলাকাটি ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকের বাস। শুনেছি মন্দির এবংমাজার নাকি কাছাকাছি সময়েই হয়েছে। মন্দির মাজার তৈরী হওয়ার সময়ও কোন দ্বন্দ হয়নি। প্রতি বছর অনেক ধুমধাম করে কালি পুজো হয় এখানে । কখনও মাজারের লোকজন বিরক্ত বোধ করেনি। আমরা মিলেমিশে যার যার ধর্ম পালন করছি।
চেলোপাড়া এলাকার সবিতা দেবীর সাথে সকালে মন্দিরে কথা হয়। তিনি জানান, কুষ্টি বিচার করতে এসেছিলাম। একই এলাকার নন্দ দাস জানান, ধর্মীও কিছু বিষয় জানতে পুরহিত মশায়ের কাছে এসেছিলাম । পাশাপাশি মাজার থাকলেও আমাদের মন্দিরে কোন সমস্যা হয়না।
সম্প্রিতি
বগুড়ায় পাশাপাশি গড়ে ওঠা এক মন্দির ও মাজারে প্রায় আড়াইশ বছর ধরে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করলেও কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত হয়নি বলে জানালেন সংশ্লিষ্টরা।বিষয়টিকে দুই ধর্মীয় বিশ্বাসী মানুষদের মাঝে এক সমপ্রীতির বন্ধন বলেও মনে করেন অনেকেই।